অয়ময়।অয়ময় অর্থ লৌহময়।নামের সাথে অবশ্য তার চরিত্রের খুব একটা মিল নেই।যথেষ্ট নরম মনের একজন মানুষ সে। নরম বলতে তুলতুলে মেঘ কিংবা টেডিবিয়ারের নরম গালের কথা মনে পড়ে।আর মনে পড়ে অরিত্রার কথা।অরিত্রা নামের অর্থ নাবিক।নামটা শুনলেই কেমন যেন জীবনানন্দ হতে ইচ্ছে করে,আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দু দন্ত শান্তি দিয়াছিলো নাটোরে বনলতা সেন।মেয়েটাও হয়তো কারো জীবন সমুদ্রের পালতোলা জাহাজের গুরুগম্ভীর নাবিক হবে। সে যাইহোক তাতে খুব বেশি ক্ষতি হওয়ার কথা নয়।কেননা মেয়েটা প্রচন্ড রকমের রুপবতি।এমন রূপবতী মেয়েরা খানিকটা অহংকারী হয়।অহংকার আর রুপ সমগোত্রীয়।অথচ এমন একটা মেয়েকে অয়ময় নিতান্তই আগ্রাহ্য করে এসেছে।চিঠি নেই,ফোনকল নেই,হটসআপ কিংবা ফেসবুক থেকেও মেয়েটাকে ব্লক করে রেখেছে।এর কারন অবশ্য অজানা।অয়ময় নিজেও জানেনা।হয়তো প্রেম পাওয়ার চেয়ে অপেক্ষা বেশি প্রিয় ওর। অরিত্রার সাথে ৫ বছর কোন যোগাযোগ ছিলনা।এর মধ্যে মেয়েটাকে স্মৃতিতে না রাখার মতো একশ একটা কারন ঘটে গেছে।অথচ কোনো এক বিচিত্র কারনে অয়ময় ভুলতে পারেনি মেয়েটাকে।এর কারণ অয়ময় তাকে ভুলতে চেয়েছিলো।কোনো কিছু ভুলতে চাওয়ার অর্থ হলো আরেকবার মনে করা।সে রোজ একবার করে ভেবেছে অরিত্রা নামটাকে সে ভুলে যাবে।যেমন করে মানুষ তার চতুর্থ পূর্বপুরুষকে ভুলে যায়,ঠিক তেমনি।তখন সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে ভেসে উঠতো টেডিবিয়ারের মতো নরম তুলে একটা মুখে কাজল আঁকা দুটো চোখ ,অধরের কাছে নক্ষত্রের মতো জ্বলে থাকা খয়েরি রঙের তিল আর কেমন জগৎ ভুলানো এক হাসি।সে হাসি আগ্রাহ্য করবার ক্ষমতা বিধাতা খুব কম পুরুষকেই দিয়েছেন।হাসির মতো ভয়ংকর অস্ত্র নারীর কাছে আছে বলেই হয়তো জগৎ জয়ী বীর মাথা নত করে নারির পায়ে।৫ বছর আগে অয়ময় ঠিক এমনই ছিলো।হুটহাট ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতো।কোথায় যেতো কেউ জানতোনা।একবার ওর ইচ্ছে হলো পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে হবে।সাধারণ মানুষের চোখে নয় একজন কবির চোখে।ঘোর লাগা পূর্নিমার শুক্লা তিতিথে ও বেরিয়ে পড়ল।ঘোর লাগা এমন জোৎস্নায় হাসন রাজা ঘর ছেড়েছিলো।গৌতমবুদ্ধ প্রেমিকার মুখে চাদের আলো দেখে একমুহূর্তকাল থমকে ছিল,তারপর বেরিয়ে পড়েছিলো পথে।আর কখনো ঘরে ফেরা হয়নি তার।চাঁদের ধারকরা আলোয় এমন কি যাদু আছে যা মানুষকে মোহগ্রস্ত করে? অয়ময় ছোট্ট একটা চিঠি শুধু গপিতলার বট গাছের কুঠুরিতে রেখে পাড়ি জমিয়েছিলো এক অচেনা পথে।শুধু চাঁদের আলোয় বটগাছের কুঠুরিতে বিশাল বড় এক সাদা পাতায় দু লাইন লেখা চকচক করছিলো,আমার বড় জোৎস্নার তৃষ্ণা গো কণ্যে,আমি চল্লাম।তোমার জন্য এক পশলা জোৎস্না নিয়ে তবেই ফিরব।
সেবার অয়ময় ফিরেছিলো প্রবল জ্বর নিয়ে।অনাহার আর রোদে ঘুরে বেড়ানোর প্রমান স্বরুপ চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ নিয়ে।হোস্টেলের ছোট্ট খাটিয়ায় বেঘোরে পড়ে রইলো টানা ৭ দিন।এর মধ্যে একদিন অরিত্রা এসে জানতে চেয়েছিল জোৎস্না এনেছো আমার জন্যে?মেয়েটার চোখ ভর্তি পানি।কাজল চোখে অশ্রু মহাবিশ্বের আরেক বিস্ময়।অয়ময় একবার চোখ খুলে মেয়েটার দিকে তাকালো।চোখ ভর্তি জলে মেয়েটাকে পূর্ণিমার চাঁদ মনে হলো ওর।ফুটপাতে শুয়ে শুয়ে গোটা এক রাত চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিলো।এমন ভয়ংকর সৌন্দর্য এক জনমে দেখে শেষ করা সম্ভব নয়।এমন সৌন্দর্যের কাছে মৃত্যুও তুচ্ছ। মেয়েটাকে সে কথা বলা যাবেনা। কিছু সৌন্দর্য আড়ালেই সুন্দর। প্রকাশ পেলেই ম্লিন হয়ে যায়। এইবেলা জোৎস্না দেখার গল্প বলা যাক।
বাসা থেকে পালিয়ে কোন নির্জন জায়গায় না গিয়ে অয়ময় এসে পৌছালো ঢাকার ব্যাস্ততম নগরী ফার্মগেটে। চারিদিকে কতরকম মানুষ। মানুষের ভিড়ে হেটে বেড়ানোর সবচেয়ে ভালো দিক হলো কেউ আলাদা করে তাকাবেনা।অনেক মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া।শহরের আকাশে চাঁদ গভীর রাতে উঁকি দেয়।যেন কেউ না দেখতে পায় অভিমানি চাঁদের মুখ।রাত পৌনে একটা।তেজগাঁও এলাকা অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছে।ওভার ব্রিজের নিচে জমাট অন্ধকার। অয়ময় বসে আছে ফুটপাতের নির্জন দেখে একটা জায়গায়।শান্ত আকাশে থালার মতো গোল চাঁদ। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চাদের আলো ঢাকা পড়ে আছে।মানুষের জীবনটাও কি এমন নয়?আমাদের নিজস্বতা এই ভাবে ঢাকা পড়ে থাকে মিথ্যার অহমিকায়। এমন সময় কারো হাতের স্পর্শে ঘোর কাটলো ওর।একটা বছর পঁচিশের মেয়ে।ঠোঁট ভর্তি টকটকে লাল লিপস্টিক। চাদরে আলোয় তার চোখ দুটো জোনাকি পোকার মত জ্বলছে।এরা সভ্য নগরের সবচেয়ে অবহেলিত ফুল।অয়ময় এখন মেয়েটার সাথে যদি অতি পরিচিতর মতো করে কথা বলে তাহলে কি মেয়েটা বিভ্রান্ত হবে?এই ধরনের মেয়েরা অতি সহজে বিভ্রান্ত হয়না।অয়ময় মেয়েটাকে বলল কেমন আছো? অনেকদিন পর দেখা তাইনা? মেয়েটা বিভ্রান্ত হলো নাকি ঠিক বোঝা গেলনা।শুধু জোনাকি জ্বলা চোখে ওর দিকে চেয়ে রইল।অয়ময় খানিকটা সরে বসার জায়গা করে দিয়ে বলল,বসো।মেয়েটা বসল।কিন্তু কোন কথা বললনা।
চা খাবে? অবশ্য এখন কোথায় চা পাওয়া যাবে আমি ঠিক জানিনা।
এই প্রথম মেয়েটা বলল,আমি জানি।
তাহলে চলো চা নিয়ে আসি।
মেয়েটা উঠে চলে গেলো এবং ২ কাপ চা নিয়ে ফিরলো।
চায়ের স্বাদ অতি চমৎকার।
অয়োময় বলল,তোমার কপালে যদি একটা টিপ থাকতো তাহলে তোমাকে বনলতা সেনের মতো লাগতো?
মেয়েটা অবাক হয়ে বলল,বনলতা সেন কে?
খুব সুন্দরী কোন মেয়ে হবে হয়তো?
হবে হয়তো বলছেন কেন? দেখেননি কোনদিন?
অয়োময় মাথা নেড়ে বলল,না।তাকে কেউ কোনোদিন দেখেনি।
তাহলে কিভাবে জানলেন টিপ পরলে আমাকে তার মতো লাগবে?
আমি জানি।কিছু বিষয় না দেখেই বেশি দেখা যায়।
মেয়েটা আর কোনো কথা বলল না,তার কোমরে গুজে থাকা একটা থলে বের করলো।তার ভেতর থেকে বের হলো একটা ছোট্ট আয়না,একটা কৌটা,একটা লিপিস্টিক আর একটা পাওডারের বোতল।মেয়েটা কৌটা খুলে একটা প্রজাপতি বের করলো।প্রজাপতির ডানা সুন্দর করে কেটে টিপ লাগালো।ঠিক কপালের মাঝখানে। প্রজাতির টিপ।অয়ময় অবাক হয়ে চেয়ে রইলো।জীবনানন্দ হয়তো একে দেখেই বনলতা লিখেছিলো।
অয়ময়কে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটা বলল,এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?
অয়ময় কোনো কথা বল্ল না।ওর চোখ ভরে উঠছে জলে।এত সুন্দর সজ্য করবার ক্ষমতা ওর নেই।
এবার মেয়েটা সত্যি অবাক হলো,বল্ল আপনি কাদছেন কেন?
অয়ময় বল্ল,অতি সুন্দর সজ্য করবার ক্ষমতা আমার নেই।আমি অতি নিঃস মানুষ। তোমাকে কিছু একটা দিতে খুব ইচ্ছে করছে যা এর আগে তোমাকে কেউ দেয়নি।
আমাকে সবাই টাকা দেয়।আমি প্রতি রাতে খুব অল্প দামে বিক্রি হই।
অয়ময় কোনো কথা বল্লনা।
জানো আমার যেদিন মন ভালো থাকে সেদিন আমি প্রজাপতির টিপ পরি।সেদিন সব ধান্দা বন্ধ রাখি।ছোটবেলায় আমি প্রজাপতি ধরে ধরে জমিয়ে রাখতাম।সবাই বলতো আমি রাজ কন্যা হবো।অথচ দেখো আমি রাস্তার কন্যা।
তোমার প্রজাপতিটা আমাকে দেবে?
মেয়েটার চোখে এবার জল জমতে লাগলো।কিন্তু কি অদ্ভুত ভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে বল্ল,তোমাকে তুমি বলছি বলে কিছু মনে করোনা,তুমি এই শহর কেন এসেছো?
চাদ দেখতে।
এ শহর খুব নিষ্ঠুর।এ শহরে চাঁদ ওঠেনা।
বলতে বলতে মেয়েটা প্রজাতির কৌটাটা এগিয়ে দিলো।অয়ময় একটা কাগজ বের করে মেয়েটার হাতে দিয়ে উঠে পড়লো।ও জানে মেয়টা তাকিয়ে আছে ওর দিকে।কিন্তু ও আর পেছন ফিরে তাকাবেনা।পেছন ফিরে তাকালে ও মায়ায় পড়ে যাবে। মায়া এ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর তম অনুভূতি। কবিদের মায়ায় পড়তে নেই।মেয়েটার হাতে কাগজে মোড়া শব্দে লেখা আছে,-
সকল বিষ্ময় কেটে যাবে একদিন,
শুধু গোধূলির আলোয় একদিন মৃত্যু এসে
বলবে আমি চির সুন্দর।
অরিত্রা আবার জিজ্ঞেস করলো, আমার জোৎস্না কোথায় কবি?
অয়োময় ঘোর লাগা জ্বরে পকেট থেকে বের করে দিল সেই প্রজাতির কৌটা।
প্রজাপতির পাখার রঙে জ্বালিয়ে দিলাম দিপ,
কপাল জুড়ে জোৎস্না উঠুক প্রজাপতির টিপ।
আজ অরিত্রার বিয়ে।মোবাইলের স্কিনে মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে। কেমন সুন্দর করে সেজেছে মেয়েটা।আবার জলে ভরে উঠছে অয়ময়ের চোখ।অতি সুন্দর সজ্য করবার ক্ষমতা ওর নেই। চোখের জল মেয়েটাকে দেখানো ঠিক হবেনা।
অরিত্রা বলল,দেখো তোমার দেওয়া প্রজাপতির টিপ পরেছি।আর কখনো পরবোনা।আমাদের আর কোনদিন দেখা হবেনা আমাদের। তুমি কিছু বলবেনা আজ?
অয়ময় বলল,আকাশ আর মাটি বড্ড বেশি ব্যাবধান কন্যে।
ফোন কেটে দিল ও।কেমন জ্বর জ্বর অনুভূত হচ্ছে। এত তৃষ্ণা পাচ্ছে কেন ওর।এখন কি পূর্ণিমা?
No comments:
Post a Comment